দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরে মধ্যপাড়ায় দেশের একমাত্র কঠিন শিলা প্রকল্প থেকে পাথর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবহনের জন্য ১৩ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপন করা হয়েছিল। প্রায় ২৮ বছর আগে নির্মিত এই রেললাইনের জন্য স্থানীয় এবং বৈদেশিক মুদ্রায় মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭১৩ কোটি ১৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল খনির উত্তোলিত ৮০ শতাংশ পাথর সড়কপথের পরিবর্তে রেলপথে সহজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা, যা সড়কপথের ভোগান্তি এবং চাপ কমাবে এবং পরিবহন খাতে বিপুল অর্থ সাশ্রয় করবে।
এ ছাড়া, সরকারের মেগা প্রকল্পের অংশ হিসেবে রেলপথে পাথর পরিবহনে খরচ কমানোর লক্ষ্যও ছিল।
১৯৯৫ সালে রেলপথ নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হলেও খনি বিভাগ ও রেলপথ বিভাগের সমন্বয়হীনতায় রেলপথটি কার্যকর হতে পারেনি। শুধু কিছু সময়ের জন্য খনির মাললোডিং পয়েন্ট থেকে মালবাহী ট্রেনে করে পাথর পরিবহন করা হয়েছিল।
অবহেলা এবং অযতেœর কারণে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রেলপথটি এতটাই অবহেলিত যে দূর থেকে দেখলে বোঝাই যায় না এটি মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পের রেলপথ।
রেলপথের বিশাল অংশ সংঘবদ্ধ চোরেরা কেটে নিয়ে গেছে। এর ফলে রেললাইনের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। অনেক স্থানে রেললাইন মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে, আর ঝোপ-ঝাড়ের কারণে রেললাইন খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রেলপথের কাঠের ¯িøপারগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেছে, আর অনেক স্থানে ¯িøপার চুরি হয়েছে।
অব্যবহৃত এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এই রেলপথে সরকারের বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ এখন একরকম অপচয়ে পরিণত হয়েছে।
মধ্যপাড়া পাথরখনি এবং রেলওয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প থেকে উৎপাদিত ৮০ শতাংশ পাথর স্বল্প খরচে এবং সহজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবহনের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ওই প্রকল্পে প্রথমে জমি অধিগ্রহণসহ রেললাইন স্থাপন এবং সব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য পেট্রোবাংলাকে প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরবর্তীতে রেলওয়ে বিভাগ এটি নিজেরাই বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষ্যে একটি প্রকল্প ধারণাপত্র (প্রজেক্ট কনসেপ্ট পেপার বা পিসিপি) গ্রহণ করা হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে স্থানীয় এবং বৈদেশিক মুদ্রায় মোট ব্যয় ধরা হয় ৭১৩ কোটি ১৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। এ নিয়ে ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং একই বছরের ৩১ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। ১৯৯৫ সালের ২৩ মার্চ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ, ও মূল্যায়ন বিভাগ প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করে।
প্রকল্পের আওতায় দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরের ভবানীপুর স্টেশন থেকে মধ্যপাড়া পাথরখনি পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন স্থাপন করা হয়। এর জন্য ৭৪ দশমিক ৪০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের অধীনে লেভেল ক্রসিং, কালভার্ট, কয়েকটি সেতু এবং একটি আধুনিক স্টেশন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে, ১৯৮১ সালে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প কর্তৃপক্ষ রেলওয়ের জন্য তাৎক্ষণিক ব্যয় হিসেবে ৪৫ লাখ ৩১ হাজার ৬৬ টাকা প্রদান করেছিল। তবে, ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রেলপথ বিভাগ ৩ শতাংশ খরচ কর্তন করে খনি কর্তৃপক্ষকে ৪৪ লাখ ৯১ হাজার ৬৬১ টাকা ৯৫ পয়সা ফেরত দেয়।
১৯৯৬ সালের শুরুর দিকে রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়। তিনটি লেভেল ক্রসিং, ছোট সেতু, এবং কালভার্ট নির্মাণসহ মধ্যপাড়ার পলিপাড়ায় ১৪ একর জমির ওপর একটি আধুনিক দ্বিতল স্টেশন নির্মাণ করা হয়। তবে বর্তমানে পাথর পরিবহন না হওয়ায় স্টেশনটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
খনি সূত্রে জানা যায়, রেলপথ স্থাপনের পর ২০০৯ সালে রেলওয়ের কাজে ব্যবহারের জন্য মধ্যপাড়া থেকে মাত্র ৫৭ হাজার ৯৩১ মেট্রিক টন পাথর রাজশাহী এবং চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, বেসরকারি ক্রেতারা সড়কপথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২,১০০ মেট্রিক টন পাথর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছেন। অথচ রেলপথে পাথর পরিবহনের খরচ প্রতি মেট্রিক টনে মাত্র ৬০০ টাকা, যেখানে সড়কপথে এই খরচ প্রায় ১,৫০০ টাকার ওপরে। রেলপথ ব্যবহৃত না হওয়ায় সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হচ্ছে।
দীর্ঘদিন রেলপথ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার সুযোগে দুর্বৃত্তরা রেললাইন চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের আগস্ট মাসে পার্বতীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের রেলের পাত চুরি করা হয়। মধ্যপাড়া স্টক ইয়ার্ড, কাঞ্চনা, নয়াপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, আদিবাসীপাড়া, এবং পলিপাড়া এলাকা থেকে রেলপাতগুলো গ্যাস কাটার মেশিন দিয়ে কেটে নিয়ে যায় চোরেরা। এসব ঘটনায় পার্বতীপুরে ১০-১২টি মামলা হলেও চুরি বন্ধ হয়নি।
বর্তমানে রেললাইনের ফিশপ্লেটসহ অন্যান্য উপকরণ চুরি হয়ে যাচ্ছে। কাঠের ¯িøপারগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেছে, আর অনেক ¯িøপারও চুরি হয়েছে। স্টেশনের ডাবল গেজ এবং ৪টি সিঙ্গেল গেজ লাইনের একটি অংশে পাথর সরিয়ে সেখানে বিভিন্ন ফলজ এবং বনজ গাছ রোপণ করা হয়েছে। হাঁড়িভাঙ্গা আম এবং মাল্টার বাগান করা হয়েছে। অন্যদিকে স্টেশনের জমির একাংশে ধান চাষ করা হচ্ছে। রেললাইন এবং স্টেশন এতটাই অবহেলিত যে প্রথম দেখায় এটিকে কৃষি খামার বলে মনে হতে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও ব্যবস্থাপনার অভাবে এবং অপর্যাপ্ত পরিকল্পনার কারণে এটি পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। রেলপথের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় সরকার আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
রংপুর জেলার বদরগঞ্জ সড়কের পূর্ব দিকে মধ্যপাড়া খনি রেলওয়ে স্টেশনের অবস্থিত। ওই সড়কের পুলিশ ফাঁড়ি এবং পাথর খনির প্রাচীর সংলগ্ন এলাকায় দেখা যায়, খনির রেল সংযোগের মিটার এবং ব্রড গেজের তিনটি লাইনের অন্তত ১ হাজার ফুট রেললাইন কেটে নেওয়া হয়েছে। খনি পাহারাদার এবং সিসি ক্যামেরা দ্বারা সুরক্ষিত থাকা সত্তে¡ও অন্ধকারে খনির প্রবেশমুখের রেললাইন কে বা কারা কেটে নিয়েছে, তা খনি কর্তৃপক্ষ জানে না।
হরিরামপুরের দলাই কোটা রেলব্রিজ এবং আদিবাসীপাড়া রেললাইনের বিভিন্ন অংশে দেখা গেছে দুর্বৃত্তরা রেললাইন কেটে নিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এটি একটি রেলপথ। রেললাইনের পাথর সরে গিয়ে পুরো পথ যেন কঙ্কালে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম, মো. লিটন আহম্মেদ এবং শহিদুল ইসলাম বলেন, যদি এতদিন স্টেশনটি চালু থাকতো, তবে এলাকাটি আলোকিত হয়ে উঠতো এবং অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু এখন যারা স্টেশনের প্রায় ১৪ একর এলাকা বন্দোবস্ত নিয়েছে, তারাই কেবল সুবিধা ভোগ করছে। রেললাইন কেটে নেওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। রেলের এত জনবল থাকার পরও প্রায় ১৪ কিলোমিটার রেললাইনের বহু অংশ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। স্টেশনের ১৪ বিঘা জমিতে আম, ধান, ভুট্টাসহ নানা জাতের ফলের বাগান গড়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে দায়িত্বে থাকা মাহবুবুল ইসলাম জানান, রিজভী আহম্মেদ নামে একজন ব্যক্তি স্টেশন এলাকার জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমি এর দেখভালের দায়িত্বে আছি। এখান থেকে যে আয় হয়, তা থেকে আমার বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়।