রমজানে চাহিদা বেশি থাকায় হাতে ভাজা মুড়ি প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের মুড়ি পল্লীর নারী শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর এলাকার একটি পরিবারে। ছবি: কালের কণ্ঠ
রমজান এলেই ইফতারে চাহিদা বাড়ে মুড়ির। মুড়ি না হলে ইফতার যেন অসম্পূর্ণ থাকে। তাই রমজানের শুরু থেকেই ঠাকুরগাঁওয়ের মুড়ি পল্লীগুলো সরব হয়ে উঠেছে। ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন এ পেশায় জড়িত কয়েক শ নারী শ্রমিক।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ও রহিমানপুর এলাকার মুড়ি পল্লীগুলোর শতাধিক পরিবার যুক্ত মুড়ি ভাজা এবং তা বিক্রির কাজে। এসব গ্রামের নারীরা ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত নিজ বাড়িতে মুড়ি ভাজার কাজে ব্যস্ত থাকেন। ভাজা শেষে নিজেরাই তা মাথায় করে শহরের বিভিন্ন মহল্লা ও হাট-বাজারে ফেরি করে বিক্রি করেন। যুগ যুগ ধরে বংশ পরস্পরায় তারা এ কাজ করে ঐতিহ্য ধরে রাখায় তাদের গ্রাম মুড়িপল্লী নামে পরিচিত।
তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
মোহাম্মদপুর এলাকার মুড়ি শ্রমিক আরতি রায় জানান, মুড়ির চাল কিনে বাড়িতে পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে লবণ মাখিয়ে রাখা হয়। তারপর রোদে শুকিয়ে মাটির হাঁড়িতে বালু দিয়ে তাতে লবণযুক্ত শুকনো চাল হাতে ভাজলেই মুড়িতে রুপান্তরিত হয়। এক মণ পরিমাণ চালের মুড়ি তৈরি করতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়।
হাতে ভাজা মুড়িতে খরচ একটু বেশি, তাই দামও একটু বেশি পড়ে।
একই এলাকার সুমিলা রায় জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে এখানকার মুড়ির চাহিদা তুলনামূলক কমতে শুরু করেছে। কারণ, হাইড্রোজ মেশানো হয় না বলে এখানকার মুড়ির রং অনেকটা লাল। আর বাজারে মেশিনে প্রস্তুত মুড়ি দেখতে সাদা ঝকঝকে এবং দাম কিছুটা কম হওয়ায় তা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। তাছাড়া ধান চালসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় তেমন লাভ হচ্ছে না।
হরিনারায়ণপুর গ্রামের মনসরি বালা বলেন, পার্শবর্তী মাদারগঞ্জ হাটে বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঋণ করে চাল কিনি। সেই চাল দিয়ে মুড়ি ভাজি। প্রতিদিন প্রায় একমণ মুড়ি মাথায় করে শহরের বিভিন্ন মহল্লায় বিক্রি করি। তিনি বলেন মুড়ি তৈরি ও বিক্রি করে যে পরিশ্রম হয় তাতে আগের মতো এখন আর লাভ হয় না। এই গ্রামের যেসব নারী এখনও মুড়ি প্রস্তুত করার কাজ করেন, তাদের প্রায় সবার হাজার দশেক টাকার বেশি পুজি নেই বললেই চলে। পুজির এই টাকা আবার ঋণ করে ব্যাবসার কাজে লাগান সবাই।
মুড়ি কারিগর বিশকা রায়, যোগেশ, মতিলাল, আরতি বালাসহ কয়েকজন জানান, কয়েক বছর আগেও এই গ্রামে তিন শতাধিক নারী মুড়ি ভাজা ও বিক্রির কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু বর্তমানে মেশিনে ভাজা মুড়ি বাজারে আসায় হাতে ভাজা মুড়ির কদর কিছুটা কমে গেছে। এ কারণে গ্রামের অনেকেই মুড়ি ভাজার কাজ বাদ দিয়ে কেউ কৃষি শ্রমিক ও অন্যান্য পেশায় জড়িত হয়েছেন। যাদের মিল-কারাখানা রয়েছে, তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ দরিদ্র মুড়ি কারিগরদের ঋণের ব্যাবস্থা নেই। সরকারিভাবে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া গেলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো।
পিয়ার মোহাম্মদ, আবু বক্কর, রোহান উদ্দীনসহ কয়েকজন ভোক্তা বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মুড়ি পল্লীর এসব লাল মুড়ি হাইড্রোজমুক্ত ও সুস্বাদু হওয়ায় চাহিদাও থাকে ব্যাপক। কিন্তু বাজারে সাদা ঝকঝকে যে মুড়ি পাওয়া যায় তাতে হাইড্রোজ ও রাসায়নিক মেশানো হয়। বেশিরভাগ মেশিনে ভাজা মুড়িতে ক্ষতিকারক রাসায়নিক মেশানো হয়, যা খেলে বিভিন্ন রোগ বালাই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝৃঁকি এড়াতে ও রোজাদারদের দিক বিবেচনা করে মুড়িতে হাইড্রোজ মেশানো রয়েছে কিনা, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে সরকারিভাবে স্খানীয় প্রশাসনের বাজার তদারকি বাড়ানোসহ রমজানে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো উচিত।
জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মাহমুদুল কবির বলেন, খুব শিগগির বাজার তদারকি শুরু করা হবে। যেসব ব্যাবসায়ী আইন অমান্য করবেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, রমজানে জেলায় ভোক্তাদের কাছে মানসম্মত পণ্য পৌছেঁ দিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী মুড়ি শিল্পের আরো প্রসার ও তা টিকিয়ে রাখতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানসহ সরকারি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের হাতে ভাজা লাল মুড়ি জেলার চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের জেলায়ও সরবরাহ করা হচ্ছে। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি মুড়ি ১০০ টাকা থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
















