ঋতুরাজ বসন্তে যেখানে সেখানে চোখে পড়ে না রক্ত লাল শিমুল গাছ। কালের বিবর্তনে সেই মূল্যবান শিমুল গাছ এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। শীতের বিদায়লগ্নে শিমুল ফুলের পাঁপড়িতে রঙিন হয়ে উঠতো প্রকৃতি। জানান দিতো ঋতুরাজ বসন্ত আগমনের কথা। একসময় সেই রক্তলাল শিমুল ফুলের ছড়াছড়ি ছিলো দিনাজপুরসহ সারাদেশেই। অথচ বছর দশেক আগেও জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের অধিকাংশ বাড়ির আনাচে কানাচে বা রাস্তার পাশে শিমুল গাছ অহরহ দেখা যেতো। কিন্তু এখন তেমন একটা চোখে পড়ে না। কমে গেছে গাছটি। বর্তমানে মানুষ এ গাছকে তুচ্ছ মনে করে কারণে-অকারণে কেটে ফেলা আর বীজ বপন না করায় শিমুল গাছের অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে। অথচ শিমুল গাছের রয়েছে নানা উপকারিতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব। বীজ ও কান্ডের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়। রোপণের ৫-৬ বছরের মধ্যে শিমুল গাছে ফুল ফোটে। ৬০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে শিমুল গাছ একশত বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।সেই মূল্যবান শিমুল গাছ এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।
এরপরেও দেখা মিলবে এখন দিনাজপুর থেকে বীরগঞ্জ মহাসড়কের ২৮ কিলোমিটার রাস্তার দুই পার্শে রক্তিম রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে শিমুল গাছের ফুল। এই মহাসড়কের বিভিন্ন গাছের ফাঁকে ফাঁকে শতাধিক এই শিমুল গাছ রয়েছে। শুধু ফুল আর ফুল, পাতা নেই, ফুটন্ত এ ফুল যেন দৃৃষ্টি কেড়ে নেয় সবার মন। পাখিরা উড়ে এসে বসছে লাল শিমুলের ডগায়। ঝড়ে পড়া শিমুলের লাল গালিচার রূপ দেখা যায় শিমুলতলায়। মোহনীয় রূপে প্রকৃতিকে রাঙিয়েছে শিমুল। যা পথচারীসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের দৃষ্টি কাড়ছে।
প্রকৃতিপ্রেমী মোসাদ্দেক হোসেন জানান,শিমুল গাছ উজাড় হওয়ায় পরিবেশে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। এ গাছ অনেক উঁচু হওয়ায় কাক, কোকিল, চিল, বকসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি বাসা বেঁধে বসবাস করতো।এ গাছ উজাড় হওয়ার ফলে এসব পাখিরা আবাসস্থল হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে। বড় গাছ না থাকায় আবাসস্থলের অভাবে ধীরে ধীরে এসব পাখিরাও হারিয়ে যাচ্ছে।
দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকার রফিকুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, সবুর চৌধুরী, ফারুক হোসেনসহ বিভিন্নজন জানায়, গ্রামবাংলায় এই শিমুল গাছ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিত। একসময় মানুষ শিমুলের তুলা কুড়িয়ে বিক্রি করতো। অনেকে নিজের গাছের তুলা দিয়ে বানাতো লেপ,তোষক, বালিশ। ছোট শিমুল গাছের মাটির নিচের অংশ মূলের উপকারিতা অনেক। ভেষজ চিকিৎসা কাজে এই গাছের রয়েছে নানাবিধ ব্যবহার। গ্রামঞ্চলের মানুষ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে শিমুলের রস ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে গাছের মূলকে ব্যবহার করতো। অপরিকল্পিতভাবে কেটে ফেলার কারণে শিমুল গাছের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। বসন্তের আগমনকে মনে করিয়ে দেয় শিমুল গাছ। কিন্তু শিমুল গাছ কেটে ফেলার কারণে প্রকৃতি যেনো তার রূপ হারিয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য্যে যেন ভাটা পড়ছে। প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুললে ব্যাপকভাবে শিমুল গাছের চারা রোপণ করা উচিত।
বিরল উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষন অফিসার শাহজাহান আলী জানান, শিমুল গাছে যখন ফুল ফোটে তখন চারদিক লালরঙে ছেয়ে যায়। শিমুল ফুল শুধু সৌন্দর্য বর্ধনই করে না। শিমুল গাছের রয়েছে নানা উপকারিতা। শিমুল গাছ ঔষধি গাছ হিসেবে পরিচিত। শিমুলের তুলা বিক্রি করে অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছে, এমন নজিরও আছে। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন আর তেমন চোখে পড়ে না শিমুল গাছের। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে শিমুল গাছ। শিমুল গাছের কাঠ দিয়ে তৈরিকৃত ফার্নিচার বেশি স্থায়ীত্ব হয় না। এছাড়া বিভিন্ন ফোমের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় শিমুল তুলা ব্যবহার কমে গেছে। শিমুল গাছ রোপণ করা প্রয়োজন। এতে পরিবেশ বিশুদ্ধ হবে। প্রকৃতিকে বাঁচাতে সকলের শিমুল গাছ রোপণ করা উচিত।


















