মনোজ রায় হিরু, আটোয়ারী (পঞ্চগড়) প্রতিনিধি ঃ
“আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার” প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে যথাযথ মর্যাদায় ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা করুনা কান্ত রায়ের সভাপতিত্বে দিবসটি উপলক্ষে র্যালী, আলোচনা সভা এবং নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য সম্বলিত পরিষদ চত্বরে স্টল প্রদর্শনী ছিল উল্লেখযোগ্য। র্যালী শেষে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন আটোয়ারী থানার অফিসার ওসি (তদন্ত) মোঃ ফারুকুল ইসলাম, আটোয়ারী উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এ.জেড.এম বজলুর রহমান জাহেদ, সাধারণ সম্পাদক কাজী মোঃ নজরুল ইসলাম দুলাল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মতিয়ার রহমান, সহ: সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আনছারুল হক, আটোয়ারী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মনোজ রায় হিরু ও আটোয়ারী উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ ইউসুফ আলী এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাহেরুল ইসলাম। বিভিন্ন দাবী ও সমাজে বিদ্যমান নানাপ্রকার বৈষম্য দূর করে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন স্থানীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি মোঃ জাফর, মহিলা উন্নয়ন সমিতির সভানেত্রী মোছাঃ নুরিমা বেগম ও মোছাঃ আফরোজা বেগম, উদ্যোক্তা মোছাঃ আমেনা বেগম, রাধানগর সমাজসেবা ফাউন্ডেশনের রত্না বানু, প্রশিক্ষণার্থী মোছাঃ হোসনেয়ারা বেগম এবং শিক্ষার্থী মিজুয়ানা জান্নাত মিজু ও সাদিয়া তাসরিন প্রমূখ। আলোচনা সভা শেষে নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য সম্বলিত বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন অতিথিবৃন্দ।
উল্লেখ্য যে, এই দিবসটি উদ্যাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমে প্রথমবারের মতো ধর্মঘট পালন করেন ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে নারী টেক্সটাইলকর্মীরা। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা মজুরি বৈষম্য ও বৈরী কর্মপরিবেশের প্রতিবাদ জানান। সম-অধিকারের পাশাপাশি কম কর্মঘণ্টা ও উপযুক্ত মজুরি দাবি করেন তাঁরা। পরবর্তীতে ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান প্রায় ১৫ হাজার নারী শ্রমিক। তাঁরা শিশুশ্রম ও বৈরী কর্মপরিবেশের প্রতিবাদ জানিয়ে কর্মঘণ্টা কমানো, বেতন বাড়ানো ও ভোটাধিকার প্রয়োগের দাবি জানান। এই আন্দোলন নারীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি বড় নজির তৈরি করে। সেই বিক্ষোভ মিছিলে চলে তৎকালীন সরকারের লেঠেল বাহিনীর দমন-নিপীড়ন। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ, জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। বিশে^র ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। এরপর পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ সাল থেকে ৮ মার্চ পালন করা শুরু হলো। বাংলাদেশেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদানের পর দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভীপ্সা নিয়ে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ এখন নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সহ সব ধরনের অর্জন উদ্যাপনের একটি বৈশ্বিক দিন। একই সঙ্গে দিবসটি লৈঙ্গিক সমতার বিষয়টিও তুলে ধরে। নারীর উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে আরও এগিয়ে নিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ডাক দেয়। সেই থেকে সারা বিশ্বের সকল দেশে ৮ মার্চ যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস।


















