সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড়
দেশের সম্ভাবনাময় উত্তরের সমতলের চা অঞ্চলে গত চা মৌসূমেও নতুন রেকর্ড করেছে। সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে চা উৎপাদনের হিসাবে পার্বত্য অঞ্চলকে পেছনে ফেলে টানা দুইবারের মত দ্বিতীয় অবস্থান দখল করেছে উত্তরের সমতলের চা অঞ্চল। তবে এবার প্রথম অবস্থানেই রয়েছে সিলেট চা অঞ্চল। গত ২০২৪ মৌসূমের চেয়ে ২০২৫ মৌসূমে চা উৎপাদন বেশি হয়েছে ৫৮ দশমিক ০১ লাখ কেজি। সদ্য সমাপ্ত মৌসূমে পঞ্চগড়সহ উত্তরের সমতল ভূমিতে দুই কোটি দুই লাখ ৪২ হাজার ৫২ কেজি চা (মেড টি) উৎপাদিত হয়েছে। ওই মৌসূমে পঞ্চগড় জেলায় চলমান ৩০টি এবং ঠাকুরগাঁও জেলার একটি চা কারখানায় নয় কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ৬১১ কেজি সবুজ চা পাতা প্রক্রিয়াজাত করে এই চা উৎপাদন করা হয় বলে বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানা গেছে। চা বোর্ডের তথ্যমতে বিভিন্ন প্রতিকুলতা শেষে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় চা চাষের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে চলতি চা মৌসূমে এই অঞ্চলের প্রায় আড়াই কোটি কেজি চা উৎপাদনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চা সংশ্লিষ্টরা। এতে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে গত বছর রেকর্ড পরিমান চা উৎপাদনের পর পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার সমতল ভূমির নতুন চা পাতা উত্তোলনের মৌসূম শুরু হয়েছে। শীতের কারণে প্রায় দুই মাস পর এরই মধ্যে চা গাছ থেকে শুরু হয়েছে নতুন পাতা তোলার কাজ। আবারও প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে চা বাগানগুলো। প্রতি বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে চা পাতা সরবরাহ না থাকায় বন্ধ হয়ে যায় চা কারখানাগুলো। প্রায় দুই মাস পর আবারও উৎপাদন শুরু হয়েছে চা কারখানাগুলোতে। তবে পুরো মৌসূম শুরু হতে চা কারখানাগুলোকে অপেক্ষা করতে হবে গোটা মার্চ মাস পর্যন্ত। তবে এবার এবার শুরুতেই সবুজ চা পাতার দামে উর্দ্ধগতি লক্ষ্য করা গেছে। বটলীফ কমিটির নির্ধারিত ২৮ টাকা দরের সবুজ চা পাতা এখন বিক্রয় হচ্ছে প্রতিকেজি ৩৪-৩৫ টাকা দরে। তবে পুরোদমে চা পাতা উত্তোলন শুরু হলে এই দর আরও নিচে নেমে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ।
পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসূম (২০২৫) পর্যন্ত পঞ্চগড়, ঠাকুরগাও, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলায় ১১ হাজার ৫৯৯ দশমিক ৮৯ একর জমিতে চা চাষ করা হয়েছে। যা আগের (২০২৪) মৌসূমে তুলনায় ৭৩ দশমিক ২ একর বেশি। পঞ্চগড় জেলার পাঁচ উপজেলায় গত মৌসূম পর্যন্ত চা আবাদ হয়েছে নয় হাজার ৮১৯ দশমিক ৭৩ একর জমিতে। এ সকল চা বাগান থেকে গত বছর আট কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪০ কেজি সবুজ চা পাতা থেকে এক কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৬ কেজি তৈরি চা উৎপাদন হয়েছে। পার্শ্ববর্তি ঠাকুরগাঁও জেলায় এক হাজার ৪৫৭ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। গত বছর এসব বাগান থেকে এক কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ৩৫৭ কেজি সবুজ চা পাতা থেকে ২৫ লাখ ৫৯ হাজার ৬৬৪ কেজি তৈরি চার উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলায় পাঁচ উপজেলায় ৩২২ দশমিক ৮৭ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। গত মৌসূমে এই তিন জেলার ২০ লাখ ৯৭ হাজার ৮১৩ কেজি সবুজ চা থেকে পঞ্চগড়স্থ কারখানাগুলোতে প্রক্রিয়াজাত করে চার লাখ ৩৪ হাজার ৪২২ কেজি তৈরী চা উৎপাদিত হয়েছে। চা বোর্ড উত্তরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৪৮টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা অনুমোদন নিয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড়ে ৩০ টি ও ঠাকুরগাঁওয়ে একটি কারখানা চালু রয়েছে। এই কারখানাগুলো চা-চাষিদের কাছ থেকে সবুজ চা-পাতা কিনে তা থেকে চা তৈরি (মেড টি) করে। এরপর সেই চা পঞ্চগড়,ও চট্টগ্রাম এবং শ্রীমঙ্গলের নিলাম বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন চা প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মালিকরা।
চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আমির হোসেন বলেন, পঞ্চগড়সহ উত্তরের চা চাষ দেশের চায়ের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উম্মোচন করেছে। পার্বত্য অঞ্চলকে পেছনে ফেলে দেশের চা উৎপাদনে দ্বিতীয় উত্তরের সমতলের চা। চা আবাদী জমির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মানসম্মত পাতায় গুনগত মান বাড়ায় এখানকার চা’র অকশন বাজারে চাহিদা বেড়েছে। আমরা আশা করছি বড় ধরণের কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ না এলে চলতি মৌসূমে এই অঞ্চল থেকে আড়াই কোটি কেজি তৈরীকৃত চা উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

















