মোতাহার হোসাইন সরকারঃ
পার্বতীপুর–পঞ্চগড় রুটে চলাচলকারী একমাত্র লোকাল ট্রেন কাঞ্চন কমিউটার–এর কোচ পরিবর্তনের পর ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আগে কম ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে আন্তঃনগর কোচ যুক্ত হওয়ায় ট্রেনটির সর্বনিম্ন ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ টাকায়।
এই রুটে দীর্ঘদিন ধরে কাঞ্চন কমিউটারই ছিল সাধারণ মানুষের ভরসা। শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ নিম্ন আয়ের যাত্রীরা মাত্র ২০ টাকা ভাড়ায় এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যাতায়াত করতে পারতেন। ফলে ট্রেনটিকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যও গড়ে উঠেছিল।
এর আগে পঞ্চগড় থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী উওরবঙ্গ মেইলসহ কয়েকটি ট্রেন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালের দিকে ইঞ্জিন, ক্রু ও কোচ সংকট দেখিয়ে এসব ট্রেন বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ডেমু ট্রেনও বেশি দিন চালু রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে পার্বতীপুর থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত নিয়মিত লোকাল ট্রেন হিসেবে চলতে থাকে কেবল কাঞ্চন কমিউটার।
পরবর্তীতে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কুড়িগ্রাম–রমনা বাজার রুটে ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে কাঞ্চন কমিউটার ট্রেনের রেক পরিবর্তন করা হয়। মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তর করে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ট্রেনটিতে আন্তঃনগর ভ্যাকুয়াম কোচ সংযোজন করা হয়। রেলের কাছে মিটারগেজ কোচ না থাকায় কাঞ্চন কমিউটারের পুরোনো রেক ব্যবহার করে চালু করা হয় রমনা কমিউটার ট্রেন।
কোচ পরিবর্তনের ফলে কাঞ্চন কমিউটার কার্যত আন্তঃনগর কোচে পরিচালিত হতে শুরু করে এবং সেই অনুযায়ী ভাড়াও নির্ধারণ করা হয়। এতে ট্রেনটির সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫ টাকায় পৌঁছে যায়। পাশাপাশি অনলাইন ও কাউন্টার—দুই মাধ্যমেই টিকিট বিক্রি শুরু হয় এবং ট্রেনটির নামের সঙ্গে কার্যত আন্তঃনগরের বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়ে যায়।
তবে যাত্রীরা বলছেন, ট্রেনটিতে আন্তঃনগর কোচ যুক্ত করা হলেও সেবার মানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাদের দাবি, ট্রেনটি এখনো আগের মতোই লোকাল ট্রেনের মতো সেবা দিচ্ছে, শুধু ভাড়াটাই বেড়েছে। বরং অন্যান্য ট্রেনের সঙ্গে ক্রসিংয়ের কারণে ট্রেনটির রানিং সময় আগের তুলনায় কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
যাত্রীদের মতে, আগে যে ট্রেনটি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী ছিল, কোচ পরিবর্তনের পর সেটির ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ৪–৫ কিলোমিটার পথের জন্যও ৪৫ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে, যেখানে একই দূরত্ব বাস বা অটোরিকশায় গেলে ১০–১৫ টাকায় যাতায়াত করা যায়।
এ কারণে অনেক যাত্রী টিকিট কাটতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে জানান স্থানীয়রা। আবার অনেকে অনলাইনে টিকিট কেটে নির্দিষ্ট আসনে বসলে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে বাকবিতণ্ডা বা ছোটখাটো ঝামেলাও তৈরি হচ্ছে। কারণ অনেক যাত্রীর কাছে এটি এখনও লোকাল ট্রেন হিসেবেই বিবেচিত।
নিয়মিত কয়েকজন যাত্রী জানান, আগে ঠাকুরগাঁও থেকে শিবগঞ্জের মতো অল্প দূরত্বের জন্য ২০ টাকা ভাড়া দিতে হতো। এখন একই দূরত্বে ৪৫ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে, যা তাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হচ্ছে। তাদের দাবি, রেল জনকল্যাণমূলক সেবা হওয়ায় অন্তত লোকাল রুটে ভাড়া সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখা উচিত।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট বিভাগের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, কাঞ্চন কমিউটার ট্রেনের ভাড়া ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা তাদেরও ইচ্ছা ছিল না। তবে রমনা কমিউটার ট্রেন চালু করতে কাঞ্চন কমিউটারকে ব্রডগেজে রূপান্তর করা হয়। লোকাল ব্রডগেজ কোচ না থাকায় বাধ্য হয়ে আন্তঃনগর ভ্যাকুয়াম কোচ দিয়েই ট্রেনটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সেই অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করলে ভবিষ্যতে কোনো সমাধান আসতে পারে। তবে আপাতত কোচ সংকটের কারণেই এই ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে।

















