আকস্মিক শিলা বৃষ্টির তাণ্ডবে দেশ সেরা লিচুর রাজ্য দিনাজপুরে মুকুলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টির সাথে শিলাবৃষ্টির কারণে আম-লিচুর মুকুল ঝরে গেছে। আবার লিচু বাগানে মধু সংগ্রহে থাকা মৌচাষীদের মধু উৎপাদনও কমে গেছে। অণ্যদিকে, আকস্মিক শিলা বৃষ্টির তাণ্ডবে ভুট্টার আবাদে নেমে এসেছে বিপর্যয়। হঠাৎ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক স্থানে মাঠজুড়ে থাকা পাকা ও আধাপাকা ভুট্টাক্ষেত মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে গেছে। আবার অনেক স্থানে শিলাবৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে আলুর ক্ষেত।পানিতে আলু ডুবে যাওয়ায় পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছে চাষীরা। লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে সংকায় পড়েছেন আলু চাষীরা। ফলে কৃষকদের মাঝে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
সোমবার দিবাগত রাতে লিচু খ্যাত দিনাজপুরের বিভিন্ন উপজেলায় তীব্র শিলা বৃষ্টিতে এইসব ক্ষতি হয়েছে। সোমবার রাতে জেলায় ১৬ মিলিমিটার বৃস্টি হয়েছে বলে দিনাজপুর আবহাওয়া অফিস জানায়।
হঠাৎ বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে আলুর ক্ষেত
হাকিমপুরে হঠাৎ করে দুদিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে আলুর ক্ষেত। পানিতে আলু ডুবে যাওয়ায় পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন আলু চাষীরা। লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে সংকায় পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষক ইয়াছিন আলী বলেন, বৃষ্টির কারণে মাঠের আলু ডুবে গেছে। আমরা কোনোভাবে আলু মাঠ থেকে উঠাতে পারছি না। যদিও ওঠানো হচ্ছে কষ্ট করে, তবে বেশিরভাগ আলু মাটির নিচে থাকছে। কারণ পানিতে কাদা হয়ে গেছে। কষ্ট করে আলু চাষ করে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে ক্ষতির মুখে পড়তে হলো।
কৃষক ইউসুফ শেখ বলেন, আমন ও বোরো আবাদের মধ্যবর্তী সময়ে জমি ফেলে না রেখে তাতে আলু আবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বীজ, সার, কীটনাশকসহ সব মিলিয়ে এবারে আলু আবাদে বাড়তি খরচ হয়েছে। লাভের আশায় মাঠে আলু রাখা হলেও বৃষ্টির কারণে সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। সেচ দিয়ে জমি থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করা হলেও আলু পঁচে যাচ্ছে। কারণ পানি পেলে আলু পঁচে যায়।
আরেক কৃষক আতোয়ার রহমান বলেন, আলু পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পঁচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো ওঠানো সম্ভব হচ্ছে সেগুলোর মান ভালো না হওয়ায় পাইকাররা নিতে চাইছে না। শ্রমিকের খরচ না ওঠার শংকায় অনেক কৃষক আলু উত্তোলন না করে জমিতেই ফেলে রেখেছেন। এতে করে চলতি মৌসুমে আলু আবাদ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক আলু চাষীরা।
হাকিমপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, আলু পরিপক্ব হওয়ার সাথেসাথেই আলু উত্তোলনের পরামর্শ ছিল, কিন্তু দাম কমের কারণে কৃষকরা ফেলে রেখেছিলেন। দ্রুত আলুর জমি থেকে পানি সেচ দিয়ে শুকানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল- যার মধ্যে অধিকাংশ জমির আলু ইতোমধ্যেই উত্তোলন হয়েছে।
শিলা বৃষ্টির তাণ্ডব লণ্ডভণ্ড ভুট্টার ক্ষেত
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় আকস্মিক শিলা বৃষ্টির তাণ্ডবে ভুট্টার আবাদে নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। হঠাৎ করে হওয়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঠজুড়ে থাকা পাকা ও আধাপাকা ভুট্টাক্ষেত মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে কৃষকদের মাঝে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। সোমবার দিবাগত রাতে তীব্র শিলা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ ভুট্টাক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শিলার আঘাতে অধিকাংশ ভুট্টা গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। অনেক জায়গায় গাছ ভেঙে গেছে, আবার কোথাও জমে থাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে ভুট্টার ক্ষেত। এতে করে চলতি মৌসুমে ভুট্টা উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, এ সময় ভুট্টা ছিল দানা গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। ফলে শিলাবৃষ্টির আঘাতে শুধু গাছই নয়, গাছের দানাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ফলনের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
উপজেলার সোনারপাড়া গ্রামের কৃষক নাইমুর রহমান বলেন,“আমার প্রায় ৩বিঘা জমির ভুট্টা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। জমিতে যা দেখছেন, সব মাটিতে পড়ে আছে। এত কষ্ট করে চাষ করেছিলাম, এখন সব শেষ। ঋণ করে চাষ করেছি, কীভাবে শোধ করবো বুঝতে পারছি না।”
লোহারবন্দ গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, “শিলা বৃষ্টির সময় মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে পাথর পড়ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল। একটা গাছও ঠিক নেই। এবার লাভ তো দূরের কথা, পুঁজি ফেরত পাওয়াও কঠিন হয়ে যাবে।”
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কিন্তু ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা অনেক সময়ই সময়মতো পান না। তাই তারা দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে সরকারি প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানান। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দ্রুত আর্থিক সহায়তা, বীজ ও সার প্রণোদনার মাধ্যমে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন, যাতে তারা আবার নতুন কোন চাষাবাদ শুরু করে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রফিকুজ্জামান বলেন, গত সোমবার দিবাগত রাতে শিলা বৃষ্টির কারণে ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সহনশীল জাতের ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।


















