বিকাশ ঘোষ,বীরগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি :দিনাজপুরের বীরগঞ্জ
উপজেলার চারটি ইউনিয়নে চলছে প্রাকৃতিক মধু সংগ্রহের মৌসুম। উপজেলার পাল্টাপুর, মরিচা,নিজপাড়া ও সাতোর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে মৌয়ালরা মধু আহরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শীত মৌসুমে ধান ফুল ও বিভিন্ন বুনো ফুলের রস থেকে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে গাছে চাক তৈরি করে, আর সেই মধু আহরণে দিনরাত পরিশ্রম করছেন স্থানীয় মৌয়ালরা।
স্থানীয়ভাবে এই প্রাকৃতিক মধু এখন অর্থনীতির নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে। পুষ্টিগুণ ও স্বাদের কারণে চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
মৌয়ালরা জানান, একটি গাছে মৌচাক বসার ২০ থেকে ২৫ দিন পর প্রথমবার মধু সংগ্রহ করা যায়, এরপর প্রতি ১৫ থেকে ২৫ দিন পরপর নতুন মধু পাওয়া যায়।
তবে পর্যাপ্ত পোশাক ও সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে মধু সংগ্রহকারীরা ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন। তারা সরকারি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।
মৌয়ালরা আরও জানান, মধু সংগ্রহের সময় হাত পরিষ্কার রাখা এবং পানির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হয়, না হলে মধুর গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতিবছর এ উপজেলায় ফুলের মিষ্টি গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে মৌমাছিরা গাছে গাছে, বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়, সংগ্রহ করে অমৃতের মতো মধুরস। তাদের দ্রুত ডানার শব্দে ভরে ওঠে চারপাশ, আর সেই মধুরস ধীরে ধীরে জমা হয় মৌচাকে,এমন চিত্র দেখা যায়।
বুধবার (২৫ মার্চ) সকালে উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের কাজল গ্রামে মৌমাছি পালন ও মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গিয়েছে মৌয়ালরদের। মৌসুমের এই সময়ে মৌয়ালরা দিন-রাত পরিশ্রম করে খাঁটি মধু
সংগ্রহ করছে।
সিরাজগঞ্জ থেকে মধু সংগ্রহ আসা একটি মৌচাষ খামারে চারজন শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করে মধু সংগ্রহ করছেন তারা। মৌয়ালর মো রাকিব ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে দুই দফায় মধু সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিবারই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মধু পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে মোট ৬০০ কেজি মধু আহরণ করা সম্ভব হয়েছে, যা স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরো বলেন, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবং ফুলের ভালো উৎপাদনের কারণে এবার মধুর উৎপাদনও বেশ সন্তোষজনক।
প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে মৌচাক পরিদর্শন, মধু সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের কাজ করতে হয়। এতে শ্রমিকদের বেশ পরিশ্রম করতে হলেও লাভজনক হওয়ায় তারা উৎসাহ নিয়ে কাজ করছেন। ঐ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মো: নুর হক ইসলাম বলেন, বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি প্রাকৃতিক মধু বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়। চাহিদা বেশি থাকায় মৌয়ালরা এখন অতিরিক্ত চাক বসানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন মৌয়ালদের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কাজল গ্রামে মধু চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো: শরিফুল ইসলাম জানান, এখানে প্রাকৃতিক বন ও ফুলের প্রাচুর্যের কারণে মানসম্মত মধু পাওয়া যায়। মৌচাষের মাধ্যমে স্থানীয়দের আয়ের সুযোগও বাড়ছে।
এ উপজেলায় প্রায় ৪২০ হেক্টর জমিতে ৪৯৬টি লিচু বাগানে লিচু চাষ হচ্ছে। এ বছর উপজেলার পাল্টাপুর, নিজপাড়া, মরিচা ও সাতোর ইউনিয়নে মোট ৭৬০ টি মৌবাক্স স্থাপন করা হয়েছে। মৌয়ালরা দিন-রাত পরিশ্রম করে ৭দিন পর পর ৮-১০ কেজি মধু সংগ্রহ করছে। তিনি আরও জানান, নিচু বাগানে মৌচাষ করলে পরাগায়ণে সহায়তা করে ফলে লিচুর উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। মৌয়ালদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও কৃত্রিম চাষ পদ্ধতি চালু করা গেলে এ অঞ্চলে মধু উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।

















