• শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:০৮ অপরাহ্ন

রাজনীতিতে বাম ধারার উন্মেষ

ঠাকুরগাঁও সংবাদ ডেস্ক : / ৪১ বার পঠিত
প্রকাশের সময় | শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

আজ সাম্প্রদায়িকতা, কালো টাকা ও অস্ত্রের ঝনঝনানি রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন ও উগ্রপন্থিদের কারণে সমগ্র জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হওয়ায় প্রগতিশীল বামধারার রাজনীতি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তদুপরি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে সংঘটিত বিপর্যয় এবং দেশের বামপন্থি দলগুলো যেমন- ন্যাপ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টিতে নানা কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহভাবে ক্ষতিকর ভাঙনের কবলে পড়ে বামশক্তিগুলোর গণভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ন্যাপ ও বাম দলগুলোর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনস্বীকার্য।

১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে দুদিনব্যাপী সম্মেলন আয়োজিত হয়েছিল। সম্মেলনের নাম ছিল ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিককর্মী’ সম্মেলন। আহ্বায়ক ছিলেন নিপীড়িত জনগণের তৎকালীন অবিসংবাদিত নেতা জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী তখন আওয়ামী লীগ নেতা (পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি) হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী। কেন্দ্রে যেমন অধিষ্ঠিত ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার-তেমনই পূর্ব পাকিস্তানের অধিষ্ঠিত ছিল আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা- যার অংশীদার ছিল মনোরঞ্জন ধরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস, হাজী দানেশ-মাহমুদ আলীর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল। অর্থাৎ দেশের মূল ক্ষমতা কেন্দ্রে দৃশ্যত আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও সেই আওয়ামী লীগেরই প্রতিষ্ঠাতাও সভাপতি মওলানা ভাসানী কেন অন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী’ সম্মেলন আহ্বান করলেন- তার পটভূমি উলেস্নখ করা প্রয়োজন। ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ওই বছরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে বিপুল ভোটাধিক্যে নির্বাচিত হয়ে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের অঙ্গ দলগুলোর মনোনীত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় মন্ত্রিসভা গঠন করে কারারুদ্ধ নির্যাতীত কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার অনুমতি দান, বন্দিমুক্তিসহ কতিপয় প্রগতিমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এবং মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক করাচি থেকে ঢাকা আসার পথে কলকাতা অবতরণ করেন। সেখানে আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় তিনি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐক্য বজায় থাকবে- এজাতীয় বক্তব্য দেওয়ায় পূর্ববাংলার নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত মুসলিম লীগ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ষড়যন্ত্র করে মাত্র ৫৮ দিনের মাথায় শেরে বাংলার নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার মন্ত্রিসভাকে বাতিল ঘোষণা করলে যুক্তফ্রন্টকে বাতিল ঘোষণা করলে যুক্তফ্রন্টের ঐক্যে ফাটল ধরতে শুরু করে ওই একই ষড়যন্ত্রের কারণে। অকস্মাৎ দেখা গেল কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে শপথ নিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, যিনি কৃষক শ্রমিক পার্টি সদ্য গঠন করে যুক্তফ্রন্টে শরিক হয়েছিলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শপথ নিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী করাচিতে ওই কেন্দ্রীয় সরকারের আইন মন্ত্রী হিসেবে। শেরে বাংলা সম্পর্কে জানা না গেলেও, শহীদ সোহরাওয়ার্দী যে ওই মন্ত্রিত্ব গ্রহণের আগে আওয়ামী লীগের কোনো অনুমোদন নেননি তা অনেকেরই জানা। মওলানা ভাসানী তখন ছিলেন বিদেশে বিশ্বশান্তি পরিষদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে। তিনি বিদেশে থেকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রে যুক্তফ্রন্টের সৃষ্ট ভাঙনের ও ওই দুই নেতার মন্ত্রিত্ব গ্রহণ ও পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরী শাসন প্রবর্তনের কঠোর সমালোচনা করে এক বিবৃতি দিলে আন্তর্জাতিক মিডিয়া তা লুফে নেয়। পাকিস্তান সরকার ঘোষণাদের, মওলানা ভাসানী পাকিস্তানে ফিরলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। তখন পূর্ব বাংলার বহু সংখ্যক এমএলএ যেমন শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান (রাজশাহী), হাজী মোহাম্মদ দানেশসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বিনাবিচারে কারারুদ্ধ করা হয়। স্বভাবতই বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশ্বশান্তি পরিষদের সম্মেলন শেষে যখন তিনি দেশে ফিরবেন- তখন গোপনে তাকে জানানো হয় ওই মুহূর্তে ঢাকায় না ফিরে তিনি যেন দিলিস্ন বা কলকাতায় অবস্থান করেন এবং দল থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরেই যেন তিনি ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন। সেই অনুযায়ী তিনি কলকাতায় অবস্থান করতে থাকেন সেখানকার একটি হোটেলে। সেখান থেকেও তিনি দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র রুখবার আহ্বান জানিয়ে একাধিক বিবৃতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে যখন আবারও আতাউর রহমান পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলেন কোয়ালিশন সরকারের, শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী পশ্চিম পাকিস্তানি দলের সমর্থনে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট পাকিস্তানের বিরোধিতা এবং সাম্রাজ্যবাদ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করায় মওলানা ভাসানী ও আওয়ামী লীগের বামপন্থি অংশ ক্ষিপ্ত হন। মওলানা ভাসানী কাগমারীতে একটি সম্মেলন ডাকেন। তাতে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ও অন্য চারজন আওয়ামী লীগ দলীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং আতাউর রহমান খানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সব সদস্য ও পূর্ব বাংলার সব জেলার বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগের সব জেলা বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগার যোগ দেন। সেখানে অনুষ্ঠিত বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে আলোচনায় আসে সোহ্‌রাওয়ার্দী অনুসৃত স্বায়ত্তশাসন, এক ইউনিট ও সাম্রাজ্যবাদঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি। মওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দী অনুসৃত নীতিগুলোর কঠোর সমালোচনা করে তাকে দলীয় রীতি অনুসরণের আহ্বান জানালে সোহ্‌রাওয়ার্দী তাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, স্বায়ত্তশাসন মানলে, এক ইউনিট ভাঙলে ও পররাষ্ট্রনীতি বদলালে পাকিস্তান টিকবে না। ব্যাপক আলোচনার পর বিপুল ভোটাধিক্যে মওলানা ভাসানীর অভিমত অনুমোদিত হয়। ক্ষুব্ধ সোহরাওয়ার্দী ও তার অনুসারীরা তৎক্ষণাৎ ঢাকা ফিরে যাব এবং দলের পাল্টা কাউন্সিল সভা আহ্বান করেন। এ সভায় সোহরাওয়ার্দী অনুসৃত ঐতিহ্যসমূহ অনুমোদিত হয় বলে ঘোষণা দিলে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীও মওলানা ভাসানীর সমর্থনে দল থেকে পদত্যাগ করেন। এই পটভূমিতে আহুত হয় ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী’ সম্মেলন দুদিনব্যাপী। তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম-যোগ দিয়েছিলাম এ সম্মেলনে। তাই আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী। ধারণাতীতভাবে সব হয় এই সম্মেলন। পূর্ব বাংলার মওলানা ভাসানী, মহীউদ্দিন আহম্মেদুল কবীর, মওলানা আহম্মেদ রহমান আকম্য হাজী মোহাম্মদ দানেশ, মাহমুদ আলী মসিউর রহমান যাদুমিয়া, পীর হাবিবুর রহমান, ওয়াপলিশ আহাদ, কাজী আবদুল বারি আবদুল মতিন (ভাষা মতিন), আবদুল হক, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, আতাউর রহমান, সেলিনা বানু প্রমুখ, সিন্ধু প্রদেশ থেকে সিন্ধ মাহাজ নেতা জিএম সৈয়দ ও আবদুল মজিদ সিন্ধি, সিন্ধহারি কমিটির নেতা হায়দার বখশ, আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুল হক ওসমানী; উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের খোদাই খিদমতগার নেতা খান আবদুল গফফার খান, ওয়ালিশ খান; বেলুচিস্তান থেকে গাউস বখ্‌শ বেজেঞ্জো, খায়ের বখ্‌শ মারী কালাতের প্রিন্স করিম খানা, ওলখান নাসির; পাঞ্জাব থেকে মিঞা ইফতিখার উদ্দিন, হাসান নাসির প্রমুখ। ক্ষমতাসীন আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের একটি দক্ষিণপন্থি অংশ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল আউয়াল প্রমুখ এই সম্মেলনস্থল আক্রমণ করে, প্রয়োজনে রূপমহল সিনেমা হলে আগুন দিয়ে এই সম্মেলনকে বানচাল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পাঞ্জাবের সর্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতা ও প্রখ্যাত প্রগতিশীল ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান টাইমসের প্রকাশক মিঞা ইফতিখার উদ্দিনকে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সম্মেলনে আসার পথে রাস্তায় ট্যাক্সিতে অবস্থানকালে আকস্মিক আক্রমণের শিকার হন, পাথরে ঢিল লেগে ট্যাক্সির কাচ ও মিঞা ইফতিখার উদ্দিনের একটি হাত ভেঙে দেওয়া হয়। তিনি পথিমধ্যে এক হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ওষুধপত্রসহ ভাঙা হাত (ব্যান্ডেজসহ) নিয়ে সম্মেলন স্থলে উপস্থিত হন। সম্মেলনের প্রথম দিন দুপুরের দিকে গোপনসূত্রে পৌঁছানো এক খবরে মওলানা ভাসানী জানতে পারেন, সিনেমা হলটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হতে পারে। তৎক্ষণাৎ মওলানা ভাসানী সম্মেলনে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে ওই ষড়যন্ত্রের কথা এবং আহ্বান জানান কোন ডেলিগেট যেন পরদিন সম্মেলন শেষ হওয়ার আগে কোনো কারণেই রূপমহল সিনেমা হলের বাইরে না যান। আরও বলেন, পরদিন ২৫ জুলাই সম্মেলন শেষ করে সকলে পল্টন ময়দানে গিয়ে জনসভা করা হবে। অতঃপর সবাই যার যার মতো সুশৃঙ্খলভাবে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাবেন। এই আহ্বান সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি ডেলিগেট অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। ওই হলেই একাধিক টয়লেট, বাথরুম ও আহারাদি এনে প্রতিদিন তিন দফা খাবার ব্যবস্থাও করা হয়। ২৫ জুলাই সর্বসম্মতিক্রমে স্থির হয়, নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার যে দলের লক্ষ্য হবে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সব আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক যুদ্ধ ও যুদ্ধ উন্মাদনার বিরোধিতা করা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শোষণমুক্ত করে সমাজতন্ত্র ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ও নারী-পুরুষের সমতা বিধান করা। দলের নাম স্থির হয় পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। তবে বেশির ভাগ নেতা চাইছিলেন ন্যাশনাল ডেমক্রেটিক পার্টি নাম রাখতে। মওলানা ভাসানী বলে ওঠেন, দলের নাম যা-ই রাখা হোক তাতে ‘আওয়ামী; শব্দটি যেন রাখা হয়। সে অনুযায়ী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নাম রাখা হয় সর্বসম্মতিক্রমে। দলটির মেনিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র ও সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হলে সব ডেলিগেটের করতালিতে হল মুখরিত হয়। নতুন কমিটি গঠন করা হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং করাচির মাহবুবুল হক ওসমানীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী এবং মহিমুদ আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মাহমুদ আলী তখন আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকারের একজন মন্ত্রী তিনিও দুদিন ধরে ওই সিনেমা হলে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। কমিটি গঠন এবং প্রস্তাবাদি অনুমোদনের পর সব ডেলিগেট মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সদর ঘাটের রূপমহল সিনেমা হল থেকে পল্টন ময়দানে মিছিল করে অগ্রসর হতে থাকলেন বাবপুর রোডের উভয় দিক থেকে বহুতল ভবনগুলোর ছাদ থেকে মিছিল ও নেতাদের লক্ষ্য করে বিক্ষিপ্তভাবে ইট-পাটকেল নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। এগুলোকে উপেক্ষা করে মিছিলটি পল্টন ময়দানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মওলানা ভাসানীসহ সব নেতাকে লক্ষ্য করে ইস্টক বৃষ্টি হতে থাকে। অনেকে রক্তান্ধ হন। তার মধ্যেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী কঠোর ভাষায় বলেন, আপনারা দেখুন আওয়ামী লীগ সরকার একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল ও জনসভাকে পন্ড করতে কীভাবে গুন্ডা লেলিয়ে দিয়েছে। আমরা আগামীতে নির্বাচনের মাধ্যমে আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচু্যত করে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের সরকার গঠন করব। এই বলতেই ব্যাপক পাথর বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রাদেশিক ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী মাহমুদ আলী দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের এই গুন্ডামির প্রতিবাদে আমি মন্ত্রিপদ থেকে পদত্যাগ করলাম। ইতিমধ্যে পুলিশের তৎকালীন ডিআইজি (ব্যক্তিগতভাবে মওলানা ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল) আবদুলস্নাহ ছুটে এসে বলেন, ‘হুজুর, ওরা আপনাকে বাঁচতে দেবে না। সরকার ইতিমধ্যেই সভার ময়দানে ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।’ বাধ্য হয়ে নেতাদের সামনে ঘিরে রেখে পেছনে হাজার হাজার কর্মী ও কিছুসংখ্যক পুলিশ পুনরায় সুশৃঙ্খল মিছিল করে সদরঘাটে পৌঁছালে সম্মেলনের কাজ শেষ হয়। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যারা এসেছিলেন, তাদের বেশিরভাগ ট্রেনে এসে ঢাকার রেলওয়ে স্টেশনে নেমেই গগনবিদারী স্স্নোগান তুলেছিলেন ‘মাশরেকী আউর মাগরেবি পাকিস্তান কি আওয়াম ইত্তেহাদ’ (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের ঐক্য জিন্দাবাদ)। সেখানে ছাত্র ইউনিয়নের শত শত কর্মী আমরা তাদের পাল্টা জনঐক্যের বিজয় ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পতন কামনা করে স্স্নোগান দিয়ে তাদের সংবর্ধনা জানাই ঢাকার সাবেক রেলস্টেশন ফুলবাড়িতে এবং মিছিলসহকারে তাদের সঙ্গে নিয়ে সম্মেলনস্থল সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে পৌঁছাই। তখন আগতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সিন্ধু প্রদেশের যুব কমিউনিস্ট নেতা কমরেড হাসান নাসির যাকে পরে সামরিক সরকার লাহোর দুর্গে ফাঁসিতে লটকিয়ে হত্যা করেছিল। সর্বাধিক স্স্নোগান দিয়ে গোটা সম্মেলনস্থল কাঁপাচ্ছিলেন তিনি। সে এক ব্যাপক উত্তেজনা যা সে সময়কার উভয় পাকিস্তানের যুবসমাজকে উদ্বেলিত করেছিল। ন্যাপ গঠনের মাধ্যমে উভয় পাকিস্তানের সব প্রদেশের মানুষের ঐক্য সর্ব প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। সব প্রদেশে ন্যাপের শক্তিশালী শাখা গঠিত হয়। সব প্রদেশেই জননন্দিত নবীন ও প্রবীণ নেতাদের নেতৃত্বে একই লক্ষ্যে জনগণ সংগঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে সমশ্চিত বাম ও উদার গণতন্ত্রী শক্তির সম্মিলিত উদ্যোগে গণআন্দোলন সৃষ্টির ভিত্তি রচিত হয়েছিল। দুই অঞ্চলের নিষিদ্ধ গোপন কমিউনিস্ট পার্টিও ন্যাপের মাধ্যমে সক্রিয় যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পাকিস্তান উত্তরকালে প্রথমবারের মতো সক্ষম হয়েছিল- যা ন্যাপের জন্মের এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত কল্পনা করাও সম্ভব হয়নি। প্রথমবারের মতো সক্ষম হয়েছিল- যা ন্যাপের জন্মের এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত কল্পনা করাও সম্ভব হয়নি। আজ সাম্প্রদায়িকতা, কালো টাকা ও অস্ত্রের ঝনঝনানি রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন ও উগ্রপন্থিদের কারণে সমগ্র জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হওয়ায় প্রগতিশীল বামধারার রাজনীতি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তদুপরি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে সংঘটিত বিপর্যয় এবং দেশের বামপন্থি দলগুলো যেমন- ন্যাপ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টিতে নানা কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহভাবে ক্ষতিকর ভাঙনের কবলে পড়ে বামশক্তিগুলোর গণভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ন্যাপ ও বাম দলগুলোর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু জনজীবনের ক্রমবর্ধমান নিত্যদিনের সমস্যা, পুঁজিবাদী শোষণ যেভাবে দিনে দিনে তীব্র হয়ে উঠছে এবং বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তির কার্যত অনুপস্থিতির কারণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে- তাতে বিশ্বাস করার কারণ আছে যে দেশের অবহেলিত যুবসমাজ বাম প্রগতিশীল রাজনীতির পতাকা পুনরায় ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ধারাবাহিক লড়াইয়ের মাধ্যমে নতুন লড়াইয়ে সামিল হবে ও ওই শূন্যস্থান পূরণ করতে সক্ষম হবে। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত একটিই- আজকের বামপন্থি দলগুলো ও তাদের নেতাকর্মীকে উপলব্ধি করতে হবে যে দ্রম্নত সব বামপন্থি শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ওই প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে সর্বাধিক প্রয়োজন। হতাশা ও প্রস্তাবনির্ভর না হয়ে ঐক্যের ব্যাপারে সক্রিয় উদ্যোগের সাফল্য অনিবার্য। রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক ও কলাম লেখক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো সংবাদ